
জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দাবিকে জাতীয় নীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের তরুণ জলবায়ুকর্মীরা। তুরস্কে অনুষ্ঠেয় কপ৩১ সম্মেলনকে সামনে রেখে শতাধিক তরুণ জলবায়ুকর্মী ২০ দফা দাবি সংবলিত ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ পজিশন ২০২৬’ প্রকাশ করেছেন।
৬৪ জেলার তরুণ এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতামতের ভিত্তিতে তৈরি এই অবস্থানপত্র মঙ্গলবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
রাজধানীর তেজগাঁওয়ের একটি মিলনায়তনে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও ব্রাইটার্স আয়োজিত চার দিনব্যাপী ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ কপ ২০২৬’-এর সমাপনী অনুষ্ঠানে অবস্থানপত্রটি প্রকাশ করা হয়।
সনদে জলবায়ু প্রশমন, স্থানীয় নেতৃত্বে অভিযোজন, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি ও ন্যায়সংগত অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, জলবায়ু শিক্ষা ও সচেতনতা, জেন্ডার সমতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং নীতিনির্ধারণে তরুণদের নেতৃত্ব—এই সাতটি ক্ষেত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘প্যারিস থেকে আনতালিয়া: এক দশকের জলবায়ু প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতা’।
আয়োজকেরা জানান, অবস্থানপত্র তৈরির সময় ৬৪ জেলার তরুণদের পাশাপাশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মতামত নেওয়া হয়েছে। ফোকাস গ্রুপ আলোচনা, গল্প বলার আয়োজন, অংশগ্রহণমূলক মানচিত্রায়ন ও কমিউনিটি স্কোরকার্ডের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি সাতটি সংকটাপন্ন এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মতামত এবং ছয়টি ঝুঁকিপূর্ণ ক্লাস্টার নিয়ে তিন বছরের গবেষণার ফলও এতে যুক্ত করা হয়েছে।
সমাপনী দিনের প্রথম পর্বে ‘ফেসিং দ্য ফ্রন্টলাইনার্স: সিএসও অ্যান্ড এক্সপার্টস’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সিসিজে-বি পরিচালক এম হাফিজুল ইসলাম খান, সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা, ইউএনডিপির শারমিন ইসলাম, ইউএন উইমেনের দিলরুবা শারমিনসহ প্রান্তিক এলাকার প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের ইয়ুথ, রেসিলিয়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট জাস্টিস লিড মো. নাজমুল আহসান।
‘চিলড্রেনস ভয়েস অন ক্লাইমেট’ শীর্ষক টকশোতে পথশিশু ও হ্যাপি হোমসের শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা তুলে ধরে। আহমেদ রেজা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন।
এ ছাড়া ‘ক্লাইমেট পলিসি নেগোশিয়েশন ফেলোশিপ’-এর ১৯ জন তরুণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আদলে একটি মক নেগোশিয়েশনে অংশ নেন। সেখানে ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন, ন্যায়সংগত রূপান্তর এবং কপ৩১-এ বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে আলোচনা ও অনুশীলন করা হয়।
বিকেলে ‘ইন কনভারসেশন উইথ ডিপ্লোম্যাটস’ পর্বে কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা তরুণদের তৈরি অবস্থানপত্র পর্যালোচনা করেন। আলোচনায় জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং নীতিনির্ধারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম বলেন, সরকারের একার পক্ষে বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। পরিবেশ সুরক্ষায় তরুণদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি দূষণ শনাক্তকরণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরিতে তাদের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (জলবায়ু, পরিবেশ ও আন্তঃমীমাংসিত পানিসম্পদ অনুবিভাগ) কাজী এহসানুল হক বলেন, জলবায়ু বিষয়ে বর্তমানে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো তরুণদের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে। তাই নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের আরও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার সুজান রাইল বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, চরম আবহাওয়া ও বাস্তুচ্যুতির কারণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মানুষ ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের মুখোমুখি হচ্ছে। কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের জন্য সরকার, স্থানীয় কমিউনিটি, তরুণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ডেনিশ দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন অ্যান্ডার্স বি. কার্লসেন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সীমানা নেই। তাই স্থানীয় পর্যায় থেকে আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণ পর্যন্ত সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনীন রশিদও জলবায়ু কার্যক্রমের কেন্দ্রে তরুণদের রাখার ওপর গুরুত্ব দেন।
নোয়াখালীর হাতিয়ার প্রান্তিক যুব প্রতিনিধি নিজাম উদ্দিন বলেন, ঝড় ও জলাবদ্ধতার কারণে দ্বীপাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগ ও চিকিৎসাসেবা প্রায়ই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও জরুরি রোগীদের জন্য এতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে মৌলিক সেবা ও স্থানীয় সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবিরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দাবিগুলো তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়।
সমাপনী অধিবেশনে তরুণদের পক্ষ থেকে ব্রাইটার্সের চেয়ারপারসন ফারিহা অমি ‘বাংলাদেশ ইয়ুথ পজিশন ২০২৬’ উপস্থাপন করেন। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানমের কাছে অবস্থানপত্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
অ্যাকশনএইড ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারপারসন ইব্রাহিম খলিল আল-জায়াদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাপনী পর্বে আয়োজকেরা জানান, তরুণদের সুপারিশগুলো কপ৩১ সম্মেলনে বাংলাদেশের সরকারি নীতিমালার অংশ হিসেবে তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ‘ইয়ুথ অ্যাসপিরেশনস’-এর মধ্য দিয়ে চার দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপ্তি হয়।
এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর পুলিশ প্লাজা থেকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ পর্যন্ত পদযাত্রার মাধ্যমে কর্মসূচির সূচনা হয়। ২০ সেপ্টেম্বর বিষয়ভিত্তিক আলোচনা এবং ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অনলাইন আলোচনা (ওয়েবিনার) অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয় মূল ও সমাপনী সম্মেলন।