
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) সহকারীর নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহারকারীদের তথ্যসুরক্ষা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে জোর দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে বিশ্বখ্যাত দুই প্রযুক্তি জায়ান্ট গুগল ও অ্যাপল। অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস অপারেটিং সিস্টেমে প্রতিদ্বন্দ্বী এআই অ্যাসিস্ট্যান্টগুলোকে সমমানের সুযোগ ও প্রবেশাধিকার দেওয়ার জন্য ইইউ যে বাধ্যবাধকতা জারি করেছে, তা ব্যবহারকারীদের গোপনীয়তা ও সার্বিক নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠান দুটি।
ইউরোপীয় কমিশনের ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ)-এর আওতায় জারিকৃত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ২০২৭ সালের জুলাই মাসের মধ্যে অ্যান্ড্রয়েড প্ল্যাটফর্মে তৃতীয় পক্ষের যেকোনো এআই সহকারীকে বিস্তৃত সুযোগ প্রদান করতে হবে গুগলকে। শুধু তা-ই নয়, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে গুগলকে তাদের সার্চ-সংক্রান্ত ডেটা অন্যান্য সার্চ ইঞ্জিন ও প্রতিদ্বন্দ্বী এআই সেবাদাতাদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
কমিশন মনে করে, এই সিদ্ধান্তের ফলে অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা নিজস্ব 'জেমিনি' (Gemini)-এর পাশাপাশি যেকোনো থার্ড-পার্টি এআই সহকারীকে ভয়েস কমান্ডের মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারবেন এবং অ্যাপস নিয়ন্ত্রণের সুযোগ পাবেন। এতে প্রযুক্তির বাজার উন্মুক্ত হবে এবং সুস্থ প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।
তবে এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে গুগল জানিয়েছে, বহিরাগত অ্যাপগুলোকে এত বিস্তৃত সুযোগ দিলে তারা ব্যবহারকারীর ডিভাইসের স্পর্শকাতর অনুমতির নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যেতে পারে, যা বড় ধরনের নিরাপত্তা বিপর্যয় ঘটাবে। এ বিষয়ে গুগলের বৈশ্বিক বিষয়ক প্রধান কেন্ট ওয়াকার বলেন, সার্চ ডেটা ভাগাভাগি করলে ব্যবহারকারীর গোপনীয়তা, ব্যবসায়িক গোপন তথ্য এবং জাতীয় নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
ইইউ-এর অবস্থানের কড়া সমালোচনা করে অ্যান্ড্রয়েড বিভাগের প্রধান সামীর সামাত উল্লেখ করেন, অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা ইতিমধ্যেই তাদের সুবিধামতো ডিফল্ট এআই সহকারী পরিবর্তনের স্বাধীনতা পাচ্ছেন।
প্রায় একই ধরনের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে অ্যাপলও। নতুন নীতি কার্যকর হলে যেকোনো ভার্চ্যুয়াল সহকারী ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্যে সরাসরি প্রবেশাধিকার পেয়ে যাবে—এমন আশঙ্কায় আইফোন ও আইপ্যাডের ইউরোপীয় ব্যবহারকারীদের জন্য সম্প্রতি ঘোষিত নতুন 'সিরি এআই' সেবা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা।
প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর প্রবল বিরোধিতার বিপরীতে ইউরোপীয় কমিশন দাবি করছে, সর্বোচ্চ নিরাপত্তা এবং ডেটা সুরক্ষা বজায় রেখেও এই নিয়মগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইইউ-এর এই পদক্ষেপের ফলে ওপেনএআই (OpenAI)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি লাভবান হতে পারে। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৩০ শতাংশ স্মার্টফোনে 'চ্যাটজিপিটি' ইনস্টল রয়েছে। ব্যবহারকারীরা যদি সিস্টেমের ভেতরে চ্যাটজিপিটির মাধ্যমে কাজ চালাতে পারেন, তবে গুগল সার্চ ও অ্যান্ড্রয়েড ইকোসিস্টেমের ওপর তাদের একক নির্ভরতা অনেকটাই কমে আসবে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই অ্যাসিস্ট্যান্টগুলোকে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত বার্তা, লাইভ লোকেশন, মাইক্রোফোন কিংবা স্ক্রিনের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ দিলে সাইবার নিরাপত্তার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। ফলে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গ্রাহকের ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষার দিকটিও সমভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।