
বিশ্বকাপের মাঠে ফুটবলারদের চমৎকার নৈপুণ্যের পাশাপাশি এবার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক মঞ্চেও বড় ধরনের চমক দেখাল তেহরান। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আকস্মিকভাবে শিথিল হওয়ায় খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে ইরানের অর্থনীতি। বিশ্লেষকদের মতে, এই শিথিলতা যদি দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে, তবে তেল রপ্তানি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার জোরালো প্রবাহ এবং নতুন বিনিয়োগের ওপর ভর করে আগামী এক দশকের মধ্যেই পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম শীর্ষ ধনী রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে ইরান।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঐতিহাসিক নিষেধাজ্ঞা ও ট্রাম্পের অভাবনীয় ছাড়
১৯৭৯ সালের ঐতিহাসিক জিম্মি সংকটের পর ১৯৮০ সালে ইরানের তেল আমদানির ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা চাপায় মার্কিন প্রশাসন। পরবর্তীতে ২০১০-এর দশকে অন্য দেশগুলোকে ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা পরোক্ষ বিধিনিষেধ চালু করা হয়। ২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের আমলে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির আওতায় কিছু নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হলেও ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তি থেকে সরে দাঁড়িয়ে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেন।
তবে চলমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গত ২২ জুন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগ সবাইকে চমকে দিয়ে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন, বিক্রি ও সরবরাহের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৭৯ সালের পর এত বড় পরিসরে ইরানি তেলের ওপর থেকে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার ঘটনা এটিই প্রথম।
অতীতের সব ছাড়ের চেয়েও বিস্তৃত
অতীতের যেকোনো মার্কিন ছাড়ের তুলনায় এবারের সিদ্ধান্তকে অনেক বেশি কার্যকর ও বিস্তৃত মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এর আগে ওবামা প্রশাসনের দেওয়া লাইসেন্সে শর্ত ছিল, ক্রেতা দেশগুলোকে পর্যায়ক্রমে ইরানি তেল কেনা কমাতে হবে। ফলে ২০১১ সালে ইরানের দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি পরের বছরই ১৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এমনকি ওবামার পারমাণবিক চুক্তিও কেবল পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞাগুলোই সাময়িক স্থগিত করেছিল।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এবারের নতুন লাইসেন্সে এমন কোনো শর্তের বেড়াজাল নেই। এখন সরাসরি মার্কিন শোধনাগারগুলো পারস্যের পেট্রোলিয়াম কিনতে পারবে এবং ডলারে তার মূল্য পরিশোধ করতে পারবে। এমনকি পূর্বে কালোতালিকাভুক্ত থাকা ট্যাংকার থেকেও তেল সংগ্রহের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
কেন হঠাৎ এত উদার হলো ওয়াশিংটন?
আলোচনার টেবিলে ইরান এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো নমনীয়তা দেখায়নি, তবুও ওয়াশিংটন হঠাৎ কেন এত বড় ছাড় দিল—তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠছে। মূল উদ্দেশ্য হলো, তেহরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা সচল রাখা এবং লেবাননে ইসরায়েলের চলমান সামরিক অভিযান সত্ত্বেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট 'হরমুজ প্রণালি' যেন খোলা থাকে, তা নিশ্চিত করা।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের উপদেষ্টা মিশেল ব্রোহার্ড জানান, “এই পদক্ষেপ বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাবে বলে আশা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। এতে চীন সস্তায় ইরানি তেল কেনার সুযোগ হারাবে এবং ইরানও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা থেকে বিরত থাকবে।”
তবে বাস্তবে এর প্রভাব কিছুটা ভিন্ন হতে পারে। কারণ, জুনের মাঝামাঝি সময় থেকেই মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দর অবরোধ শিথিল করায় দেশটি ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ তেল রপ্তানি শুরু করে দিয়েছে।
ঘুরে দাঁড়াচ্ছে তেল খাত
তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার ডেভিড ওয়েচ বলেন, “মে মাসে যেখানে ইরানের তেল রপ্তানি কার্যত শূন্যের কোঠায় ছিল, সেখানে এখন তা দৈনিক ১৫ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে।”
তেহরানের প্রধান প্রধান রপ্তানি টার্মিনাল, বিশেষ করে খারগ দ্বীপ থেকে আন্তর্জাতিক জাহাজে তেল বোঝাইয়ের হার নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও যুদ্ধের আগের দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল রপ্তানির মাইলফলক ছুঁতে দেশটির আরও কিছুটা সময় লাগবে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে নতুন উদ্বেগ
মার্কিন প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা শিথিলের মূল লক্ষ্য হরমুজ প্রণালি মুক্ত রাখা হলেও, বাস্তব চিত্র এখনো পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। গত ১৭ জুন ট্রাম্প যখন ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তিতে সই করেন, তার মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ইরান পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুঁশিয়ারি দেয়। এতে চুক্তি-পরবর্তী সময়ে অন্যান্য বিদেশি জাহাজের চলাচল যেটুকু বেড়েছিল, তা থমকে যায়। বিপরীতে ইরানের নিজস্ব পতাকাবাহী জাহাজের যাতায়াত ক্রমশ বাড়ছে।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালিতে বর্তমানে জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির পাশাপাশি আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনাও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরান এই নৌপথ ব্যবহারকারী বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর বিশেষ টোল বা মাশুল আরোপ করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন খরচ বাড়িয়ে দেবে। গত ২২ জুন তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, তারা এই নৌপথ ‘পরিচালনা’ করবে এবং জাহাজ চলাচল সমন্বয়ের জন্য একটি ‘টেলিফোন হটলাইন’ চালু করবে।
ইরানের জন্য এক মহাসুযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই নীতিগত পরিবর্তনের সুফল কতটা আসবে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও, ইরানের জন্য এটি এক পরম আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। লজিস্টিক জটিলতা ও ব্যাংকিং লেনদেনের বাধা দূর হওয়ায় ইরানি তেল কোম্পানিগুলো এবং দেশটির সরকার এখন প্রতি ব্যারেল তেল বিক্রি করে আগের চেয়ে অনেক বেশি মুনাফা ঘরে তুলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই আন্তর্জাতিক ছাড়ের ফলে শুধু তেল রপ্তানিই বাড়ছে না, বরং মজুত খালি হওয়ায় দেশের ভেতরের স্থবির খনিগুলোতে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই নীতি বহাল থাকলে, অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত হওয়া, সম্ভাব্য ট্রানজিট ফি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুত আর্থিক সহায়তা যুক্ত হয়ে আগামী দশ বছরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শীর্ষ অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে।