
আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়তে শুরু করেছেন সাধারণ মানুষ। শেষ মুহূর্তের টিকিট সংকট, মহাসড়কের চিরচেনা যানজট আর নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে অনেকেই ছুটির আগেই নাড়ির টানে বাড়ির পথ ধরেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটি শুরু না হওয়ায় বাস টার্মিনালগুলোতে এখনও উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়নি, যার ফলে কোনো বাড়তি ভাড়া ছাড়াই স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন যাত্রীরা। তবে ভিড় কম থাকলেও দূরপাল্লার যানবাহনগুলো তাদের নির্ধারিত সময়সূচি মেনেই রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছে।
আজ শনিবার (২৩ মে) সকালে ঢাকার বিভিন্ন বহির্গমন পয়েন্ট ও বাস টার্মিনালগুলো ঘুরে এবং যাত্রী ও পরিবহন খাতের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে ঈদযাত্রার এই স্বস্তিদায়ক চিত্র দেখা গেছে।
সার্বিক প্রস্তুতির বিষয়ে মহাখালী বাস মালিক সমিতির কার্যকরী সভাপতি আবুল কালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, “ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে টার্মিনালের ভেতর-বাহিরে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। কেউ যেন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে, সে বিষয়ে কমিটির সদস্যরা নজর রাখছেন। এছাড়া র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। সবমিলে এবার ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষকে কোনো ধরনের ভোগান্তিতে পড়তে হবে না।”
সরেজমিনে মহাখালী, সায়েদাবাদ ও গাবতলী বাস টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায়, সাধারণ সময়ের চেয়ে যাত্রী উপস্থিতি কিছুটা বেশি। কাউন্টারগুলোতে টিকিট বিক্রেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন এবং কোথাও কোথাও ছোটখাটো লাইনও চোখে পড়েছে। সব কাউন্টারেই নির্ধারিত মূল্যে টিকিট বিক্রি হচ্ছে। আর যেসব পরিবহনের নির্দিষ্ট কাউন্টার নেই, সেগুলোর চালক ও সহকারীরা হাঁকডাক দিয়ে যাত্রী তুলছেন। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ না থাকলেও দেশের বিভিন্ন জেলার উদ্দেশে দূরপাল্লার বাসগুলো নিয়মিত ছেড়ে যাচ্ছে।
টার্মিনালে অপেক্ষারত যাত্রীরা জানান, ঈদের মূল ছুটি শুরু হলে সড়কে তীব্র জটলা ও টিকিটের জন্য হাহাকার তৈরি হয়। সেই চিরকালীন ভোগান্তি এড়াতেই তারা এবার আগেভাগে ঢাকা ছাড়ছেন।
নাটোরগামী যাত্রী জুবায়ের আহমেদ বলেন, “এবার ট্রেনের টিকিট পাইনি। তাই বাসে যেতে হচ্ছে। সরকারি ছুটি হলে সড়কপথে যানজট তৈরি হয়, সে কারণে আগে চলে যাচ্ছি।”
একইভাবে নিজের স্বস্তির কথা জানিয়ে কিশোরগঞ্জগামী কলেজছাত্রী আরিফা আক্তার বলেন, “প্রতিবছর ঈদের দু-একদিন আগে বাড়ি যাই। কিন্তু এবার আগে চলে যাচ্ছি। এবার বাসের টিকিট পেতে কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হয়নি। অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া লাগছে না। গতবছর দ্বিগুণ ভাড়ায় বাড়ি ফিরতে হয়েছিল।”
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ঈদের ছুটি শুরু না হলেও অগ্রিম টিকিটের চাহিদা ব্যাপক। একতা পরিবহনের কাউন্টার মাস্টার বোরহান পারভেজ যুগান্তরকে বলেন, “ঈদের ছুটি শুরু না হলেও যাত্রীদের কিছুটা চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অগ্রিম টিকিটের চাপটা অনেক বেশি। ইতোমধ্যে ২৫-২৬ তারিখের সব টিকিট শেষ। যাত্রীদের চাপের কথা মাথায় রেখে অতিরিক্ত বাস রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। আশা করি সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিরাপদে ঈদযাত্রা শেষ করতে পারবে।”
রাজধানীর অন্যতম প্রধান টার্মিনাল মহাখালী থেকে ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নওগাঁ, নাটোর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, সিলেট ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন রুটে যাত্রী পরিবহনের জন্য দুই হাজারেরও বেশি বাস নিয়োজিত রয়েছে। এবার লম্বা ছুটির বিষয়টি মাথায় রেখে যাত্রীদের ভোগান্তিমুক্ত যাত্রা নিশ্চিত করতে বাড়তি বাসের ব্যবস্থা রেখেছেন মালিকরা। প্রতিবছর এই টার্মিনালে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিস্তর অভিযোগ উঠলেও এবার এখন পর্যন্ত তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যা যাত্রীদের মনে স্বস্তি এনে দিয়েছে।
রেলপথে আনুষ্ঠানিক ঈদযাত্রা শুরু:
বাসের পাশাপাশি ট্রেনযোগেও ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে রেলের অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীদের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে আজ শনিবার থেকে। মূলত গত ১৩ মে যারা অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করেছিলেন, তারাই আজ রাজধানী ছাড়ছেন। আর ১৪ মে কেনা টিকিটের যাত্রীরা আগামীকাল রওনা হবেন। ফলে কমলাপুরসহ দেশের বড় বড় রেলওয়ে স্টেশনে এখন ঘরমুখো মানুষের ভিড় ক্রমেই বাড়ছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, “ঈদযাত্রায় ট্রেনের শিডিউল ঠিক রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া ঈদ উপলক্ষ্যে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহণে ১০টি ঈদ স্পেশাল ট্রেন চালু করা হয়েছে। এবারও ঈদযাত্রায় শতভাগ টিকিট অনলাইনে বিক্রি হয়েছে।” ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ না করার অনুরোধ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “যাত্রার দিন নির্ধারিত ট্রেনে ২৫ শতাংশ আসনবিহীন টিকিট বিক্রি করা হবে যাত্রীদের অনুরোধে।”
এদিকে, ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে গতকাল শুক্রবার থেকে ট্রেনের ফিরতি অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়েছে। শুক্রবার দেওয়া হয়েছে ১ জুনের টিকিট এবং আজ শনিবার বিক্রি হচ্ছে ২ জুনের ফিরতি টিকিট।
মাঠে নেমেছে বিজিবি:
পবিত্র ঈদুল আজহায় মহাসড়কের যানজট নিয়ন্ত্রণ ও সাধারণ মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে মাঠে নেমেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। ঈদের পরের ৩ দিন পর্যন্ত বিভিন্ন যানজটপ্রবণ এলাকায় তারা এই দায়িত্ব পালন করবেন। শুক্রবার বিজিবি সদর দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যানজট নিরসন ও জনসাধারণের ঈদযাত্রা সহজ করতে রাজধানীর এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে টোল প্লাজা, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার টোল প্লাজা এবং পদ্মা সেতু টোল প্লাজায় ইতিমধ্যে বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।