
বিরোধীদের রাজধানীমুখী বিক্ষোভ ঠেকাতে পাকিস্তানে শত শত পণ্যবাহী ট্রাক ও কনটেইনার আটকে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এতে দেশটির পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটার দূরের করাচি বন্দরেও। বন্দরে জমছে পণ্যবাহী কনটেইনার, ব্যাহত হচ্ছে সরবরাহ। পুলিশের হাতে গাড়ি জব্দ হওয়ার আশঙ্কায় উত্তর পাকিস্তানের পথে ট্রাক পাঠাতে অনীহা দেখাচ্ছেন অনেক পরিবহন ব্যবসায়ী। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
কারাগারে থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) ইসলামাবাদমুখী বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সামনে রেখে এ পদক্ষেপ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথে বড় বড় পণ্যবাহী কনটেইনার বসানো হয়েছে। কোনো কোনো কনটেইনারে বালু ভরে পাশাপাশি সাজিয়ে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী দেয়াল। বিক্ষোভকারীদের ইসলামাবাদে প্রবেশ ঠেকানোই এর উদ্দেশ্য। তবে রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণের এই উদ্যোগে ব্যাহত হচ্ছে দেশটির বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা।
পরিবহন মালিকদের সংগঠনগুলোর হিসাব অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে বিভিন্ন স্থানে দুই হাজারের বেশি ট্রাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী যান জব্দ করা হয়েছে অথবা আটকে রাখা হয়েছে। এসব যানবাহনের অনেকগুলোতেই পণ্য বোঝাই ছিল। কয়েক দিন ধরে গাড়ি আটকে থাকায় নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা যাচ্ছে না। একই সঙ্গে বাড়ছে পরিবহন ব্যয় ও কনটেইনার ভাড়া।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করাচির পরিবহন ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে অনেক মালিক পাঞ্জাব প্রদেশের ভেতরে কিংবা আরও উত্তরে ট্রাক পাঠাতে চাইছেন না। বিশেষ করে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে গাড়ি পাঠানোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, পথে পুলিশ গাড়ি থামিয়ে কনটেইনার জব্দ করতে পারে। রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেগুলো ফেরত না পাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর করাচিতে পণ্য জমতে শুরু করেছে। বন্দর থেকে স্বাভাবিক গতিতে পণ্য পরিবহন করা না যাওয়ায় আমদানি করা পণ্যের সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এ অচলাবস্থা দীর্ঘ হলে শিল্পকারখানা, খুচরা বাজার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
পরিবহন খাতের হিসাব অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের বেশি একটি কনটেইনার আটকে থাকলে প্রতিদিন ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাকিস্তানি রুপি পর্যন্ত অতিরিক্ত ডেমারেজ বা বিলম্ব ফি দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে ট্রাক অলস পড়ে থাকার ক্ষতি, চালকদের মজুরি, বাড়তি জ্বালানি ব্যয় এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারার আর্থিক চাপ।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ট্রাকচালকেরা। তাঁদের অনেকেই কয়েক দিন ধরে একই স্থানে গাড়ি নিয়ে আটকে আছেন। অধিকাংশ চালকের আয় নির্ভর করে গাড়ি চলাচলের ওপর। ফলে যানবাহন আটকে থাকায় তাঁদের আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাব এভাবে সাধারণ পরিবহন শ্রমিকদের জীবিকাতেও পড়ছে।
পাকিস্তানের অর্থনীতিও এমনিতেই মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে রয়েছে। গত বছরের তুলনায় পরিবহন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর মধ্যে পণ্যবাহী যান আটকে রাখা এবং দীর্ঘ দূরত্বে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ট্রাক মালিকদের সংগঠনগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, দ্রুত জব্দ করা যানবাহন ছেড়ে দেওয়া এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না করা হলে তারাও আন্দোলনে নামতে পারে। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে।
ইমরান খানকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘদিনের। ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। তাঁর মুক্তি ও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে পিটিআই নিয়মিত রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করে আসছে। সর্বশেষ ইসলামাবাদমুখী কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে প্রশাসন।
তবে বিক্ষোভকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে বসানো কনটেইনারের দেয়াল এখন দেশটির অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। যে কনটেইনারগুলোতে পণ্য পৌঁছানোর কথা ছিল বাজারে, সেগুলোই এখন সড়কে দাঁড়িয়ে আছে রাজনৈতিক ব্যারিকেড হয়ে।