
পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিস্ফোরক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে তোলপাড় শুরু হয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণার মঞ্চ থেকে বিজেপিকে নিশানা করে দেওয়া তাঁর কিছু অত্যন্ত কড়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এবার কলকাতার বাগুইআটি থানায় একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত ২৭ এপ্রিল একটি বিশাল নির্বাচনী জনসভায় বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘আমি দেখব, ৪ তারিখ রাত ১২টার পরে কে তাদের বাঁচাতে আসে। এই জল্লাদদের কত ক্ষমতা আছে, আর দিল্লি থেকে কোন বাবা তাদের উদ্ধার করতে আসে, সেটাও দেখব।’
তৃণমূলের এই শীর্ষ নেতার এমন মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পরপরই রাজনৈতিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
হুমকির অভিযোগ ও থানায় ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ জমা
মামলার আবেদনকারীর স্পষ্ট দাবি, অভিষেকের এই ধরনের বক্তব্য কেবল সাধারণ কোনো রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি নয়; বরং এটি স্পষ্টতই বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক কর্মীদের সরাসরি হুমকি দেওয়া এবং ভোটের মাঠে সম্ভাব্য সহিংসতা উসকে দেওয়ার একটি পরিকল্পিত অপচেষ্টা।
পুলিশি সূত্র থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন নির্বাচনী জনসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দেওয়া বিতর্কিত বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপ, অডিওর লিখিত প্রতিলিপি এবং একাধিক ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ অভিযোগের সাথে থানায় জমা দেওয়া হয়েছে। এসব নথির প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের পর শুক্রবার রাতে বাগুইআটি থানায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটি রুজু করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই মামলায় ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) একাধিক ধারা এবং তথ্যপ্রযুক্তি আইনের (আইটি অ্যাক্ট) কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর বিধান যুক্ত করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়া এই বক্তব্যের ক্ষতিকর প্রভাব, জনমনে এর প্রতিক্রিয়া এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর সম্ভাব্য রূপ কী হতে পারে—তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যেসব ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে দুটি ধারা সম্পূর্ণ জামিন অযোগ্য হওয়ায় তৃণমূলের এই হেভিওয়েট নেতার জন্য আইনি জটিলতা অনেকটাই বেড়ে গেল।
তৃণমূলের পাল্টা দাবি বনাম বিজেপির গণতন্ত্রের যুক্তি
চলতি নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিরুদ্ধে একের পর এক আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। একাধিক রাজনৈতিক সমাবেশে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, তাদের সাংগঠনিক কাঠামো এবং বিরোধী জোটকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করতে দেখা গেছে তাঁকে। তখন থেকেই বিরোধীদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হচ্ছিল যে, অভিষেকের এসব উগ্র বক্তব্য রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা ছড়াচ্ছে এবং মাঠপর্যায়ের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করছে।
অবশ্য এই আইনি পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও সাজানো বলে দাবি করছে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। জোড়াফুল শিবিরের একাংশের মতে, চলতি নির্বাচনে নিশ্চিত ভরাডুবির আশঙ্কা থেকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে গেরুয়া শিবির এই ধরনের ভিত্তিহীন মামলা করাচ্ছে। দলটির বক্তব্য, রাজনৈতিক মঞ্চে কড়া ভাষায় বাকযুদ্ধ বা আক্রমণ নতুন কোনো ঘটনা নয়; কিন্তু বিজেপি নিজেদের রাজনৈতিক পরাজয় ঢাকতে এখন প্রশাসনিক ক্ষমতা ও পুলিশকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
এর বিপরীতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বিজেপি শিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক বক্তব্যেরও একটি নির্দিষ্ট পরিশীলিত সীমা থাকা উচিত। বিরোধী দলটির অভিযোগ, জনসভা থেকে প্রকাশ্য মঞ্চে এভাবে হুমকির ভাষা ব্যবহার করা সুস্থ গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং দেশের প্রচলিত আইনের চোখে এটি একটি গুরুতর অপরাধ। এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেছেন, ‘political মতবিরোধ থাকতেই পারে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বার্তা দেওয়া যায় না।’
এদিকে থানায় এই হাইপ্রোফাইল মামলাটি দায়ের হওয়ার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অলিন্দে জোর গুঞ্জন ও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ভোট-পরবর্তী সম্ভাব্য আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক সংঘর্ষের আবহে এই মামলাটি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন করে ঘি ঢালল বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আগামী দিনে এই মামলার তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং এর রাজনৈতিক প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী হয়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।