
ওয়াশিংটনের একপেশে নীতি ও অন্যায্য আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে একযোগে সোচ্চার হওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ভ্যাটিকানের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু পোপ লিও চতুর্দশের কাছে পাঠানো এক বিশেষ চিঠিতে তিনি এই বৈশ্বিক সংহতির তাগিদ দেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মাঝে এক নতুন কূটনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
ইরানের বার্তা সংস্থা ‘মেহের নিউজ এজেন্সি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পোপের কাছে পাঠানো চিঠিতে ইরানি প্রেসিডেন্ট চলমান সংঘাতের এক ভয়াবহ ও রক্তাক্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। পেজেশকিয়ান উল্লেখ করেন, চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া তীব্র মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ সামরিক আগ্রাসনের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি, বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিত্ব এবং ৩ হাজার ৪৬৮ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। শুধু তা-ই নয়, এই হামলায় দেশটির অসংখ্য স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। চিঠিতে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে “স্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ” হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
পোপের ভূমিকার প্রশংসা ও ট্রাম্পের অহংকারের নিন্দা
চিঠিতে বৈশ্বিক অহংকার ও দম্ভের তীব্র সমালোচনা করতে গিয়ে পবিত্র কুরআন এবং বাইবেলের আধ্যাত্মিক বাণী উদ্ধৃত করেন ইরানি প্রেসিডেন্ট। সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট অজুহাতে শান্তি আলোচনা চলাকালীন যেভাবে আকস্মিক এই আক্রমণ চালানো হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পোপের নেওয়া “নৈতিক, যৌক্তিক ও ন্যায়সংগত” অবস্থানের ভূয়সী প্রশংসা করেন পেজেশকিয়ান।
মার্কিন প্রশাসনের কঠোর সমালোচনা করে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ইরানের ঐতিহাসিক সভ্যতাকে ধ্বংস করার’ যে ঘোষণা মার্কিন প্রেসিডেন্ট দিয়েছেন, তা আসলে তাদের একচ্ছত্র ক্ষমতার মোহ ও দৃষ্টিভ্রমেরই বহিঃপ্রকাশ।’
তিনি দৃঢ়তার সাথে মনে করিয়ে দেন যে, ইরানি ভূখণ্ডে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরম সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে আসছে এবং ইরান কখনো নিজ থেকে কোনো প্রতিবেশীর জন্য নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দাঁড়ায়নি। তবে দুঃখজনকভাবে, পারস্য উপসাগরীয় উপকূলীয় দেশগুলোতে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে ইরানের ওপর এই অন্যায় হামলা চালানো হয়েছে। ফলস্বরূপ, আত্মরক্ষার আন্তর্জাতিক ও বৈধ অধিকার থেকেই ইরানি সশস্ত্র বাহিনী সেখানে আগ্রাসনকারীদের স্বার্থের ওপর পাল্টা আঘাত হানতে বাধ্য হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি সংকট ও ইসলামাবাদের মধ্যস্থতা
বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ হরমুজ প্রণালির বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ওই অঞ্চলে চলমান নিরাপত্তাহীনতার মূল উৎস হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ হামলা এবং অন্যায় নৌ-অবরোধ। ওয়াশিংটনের এই অযাচিত হস্তক্ষেপ ও নিরাপত্তাহীনতা দূর হওয়ামাত্রই আন্তর্জাতিক সব আইন মেনে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল পুনরায় শুরু হবে।
হোয়াইট হাউজ বারবার দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বরখেলাপ ও বিশ্বাসঘাতকতা করা সত্ত্বেও ইরান এখনও শান্তি বজায় রাখতে কূটনীতি এবং প্রতিবেশী পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সংলাপে বসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে পুনর্ব্যক্ত করেন পেজেশকিয়ান। চিঠির শেষাংশে তিনি স্পষ্ট করে লেখেন, মার্কিন সরকারের অবৈধ ও অন্যায্য দাবির বিরুদ্ধে ইরানের এই আপসহীন অবস্থান আসলে আন্তর্জাতিক আইন এবং চিরন্তন মানবিক মূল্যবোধ রক্ষারই শামিল। একই সঙ্গে তিনি এই বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়কে বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানান।
যেকোনো আন্তর্জাতিক বিবাদের শান্তিপূর্ণ, আইনি ও নৈতিক সমাধানের প্রতি ইরানের চিরন্তন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে পোপ লিও চতুর্দশের কাছে পাঠানো এই চিঠি শেষ করেন প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান।