
মসজিদের ইমামতি, ওয়াজ-নসিহত কিংবা খুতবার মধ্যেই আলেমদের দায়িত্ব সীমাবদ্ধ নয়—জাতির সংকটময় সময়ে সঠিক দিকনির্দেশনা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক ভূমিকা পালনে তাদের আরও সক্রিয় হতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি মিলনায়তনে জামায়াতের কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির আয়োজনে জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
‘মতবিরোধ নয়, ঐক্যেই গড়ি আগামীর বাংলাদেশ’ স্লোগানে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সভাপতি ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম। প্রস্তাবনা উপস্থাপনা ও অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় উলামা বিভাগীয় কমিটির সেক্রেটারি এবং তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ড. লুৎফুর রহমান মাদানী।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আলেমদের চিন্তা ও মতামত সব ক্ষেত্রে এক হবে—এমন নয়। অতীতেও মতপার্থক্য ছিল, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবে ভিন্নমতের কারণে কাউকে অসম্মান করা উচিত নয়। কেউ সমালোচনা বা কটূক্তি করলেও তার জবাবে একই ধরনের আচরণ না করে ধৈর্য ও সংযমের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে।
প্রতিপক্ষের জন্য দোয়া করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের বক্তব্যে ভালো বা কল্যাণকর কোনো বিষয় থাকলে সেটি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রচার বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কারও আক্রমণের জবাবে পাল্টা আক্রমণে না গিয়ে ধৈর্য ও সংযমের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলার পরামর্শ দেন জামায়াত আমির।
ইসলামি জ্ঞান ও আধুনিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে আলিয়া ও কওমি—দুই ধরনের শিক্ষাব্যবস্থারই প্রয়োজন রয়েছে। আলিয়া শিক্ষায় শিক্ষিতরা সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন। অন্যদিকে কওমি শিক্ষায় শিক্ষিতরা দ্বীনের মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ন রেখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
তাই কোনো একটি শিক্ষাধারাকে বাদ না দিয়ে উভয় ধারার আলেম ও শিক্ষিত মানুষকে সম্মান ও সহযোগিতার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জ্ঞান ও গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, যে জাতি জ্ঞান ও গবেষণায় যত বেশি অগ্রসর হয়, বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও তাদের তত বেশি বাড়ে। এ কারণে আলেমসহ সবাইকে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চায় আরও মনোযোগী হতে হবে। ইসলামি জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা এবং গবেষণাকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ও বিভিন্ন যুদ্ধের উদাহরণ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বড় কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগে তথ্য সংগ্রহ, পরিস্থিতি বিশ্লেষণ এবং যথাযথ প্রস্তুতি অপরিহার্য। বর্তমান সময়ের যেকোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তথ্য, গবেষণা, দক্ষতা ও প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, শান্তি চাই। তবে কেউ আক্রমণ চাপিয়ে দিলে আত্মরক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। ইসলামের যুদ্ধনীতি মূলত আত্মরক্ষামূলক ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কোনো নির্দিষ্ট দল বা গোষ্ঠীর বিজয়ের পরিবর্তে মানবতার বিজয় প্রত্যাশা করেন জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, মানুষের কল্যাণ ও নিরাপত্তা ন্যায়ভিত্তিক সমাজের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আল্লাহর বিধান ও ন্যায়নীতির ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা গেলে কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি। দেশের মানুষের মধ্যে নৈতিকতা, সত্য, ন্যায় ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় আলেমদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে উল্লেখ করে এ দায়িত্ব আরও নিবিড়ভাবে পালনের আহ্বান জানান।
বর্তমান সমাজে মানুষের সম্মান, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তনে আলেমদের আরও সোচ্চার হতে হবে। সত্যকে সত্য এবং অন্যায়কে অন্যায় হিসেবে তুলে ধরতে হবে।
তিনি বলেন, সত্য ও ন্যায়ের কথা বললে বাধা আসতে পারে। কিন্তু সেই আশঙ্কায় হকের কথা বলা থেকে বিরত থাকা যাবে না। একই সঙ্গে উসকানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।
দেশের সব ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার মানুষকে সম্মানের সঙ্গে ধারণ করে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান জামায়াত আমির। তার মতে, পারস্পরিক সম্মান, ঐক্য, নৈতিকতা, জ্ঞানচর্চা ও আত্মসংযমের মাধ্যমে একটি সুন্দর বাংলাদেশ নির্মাণ সম্ভব।
সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের বিভিন্ন পেশা, শ্রেণি ও মর্যাদার মানুষের সঙ্গে সবচেয়ে ধারাবাহিক এবং সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে আলেমদের। মানুষের কাছে কোনো বার্তা পৌঁছে দেওয়া, সমাজ পরিবর্তন কিংবা সভ্যতা ও পরিবারের পরিবর্তনে তারা নিয়ামক ভূমিকা রাখতে পারেন।
ইসলামের বিভিন্ন বিধান ও ফরজ দায়িত্ব সম্পর্কে মানুষের মধ্যে থাকা ভুল ধারণা দূর করে ইসলামের সঠিক শিক্ষা তুলে ধরতে আলেমদের আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
জাতীয় উলামা প্রতিনিধি সম্মেলনে সাতটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
মাদরাসা ও কলেজে ইসলামি শিক্ষা সংকোচন বন্ধ করা;
মাদরাসার নারী শিক্ষার্থীদের ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের নির্দেশ প্রত্যাহার;
উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উলামা-মাশায়েখদের হেয়প্রতিপন্ন করার প্রচেষ্টা বন্ধ করা;
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত বাতিল করে ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগ;
ইবতেদায়ি মাদরাসা জাতীয়করণ;
ইমাম-মুয়াজ্জিনদের সার্ভিস রুল ও পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়ন;
ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের সব দেশে মুসলিম হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করা।
সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা উলামা প্রতিনিধিরা অংশ নেন।