
পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা ভালো নেই। তাদের দুর্দশা শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এটি দরজায় হঠাৎ ভিড় জমে ওঠার ভয়, উপাসনালয়ের সামনে পুলিশের বদলে উত্তেজিত জনতাকে দেখতে পাওয়ার ভয়, মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে নিরাপদে ফিরবে কি না সেই শঙ্কা, কিংবা একটি অভিযোগে রাতারাতি নিজের ঘর, দোকান, জমি ও পরিচিত পাড়া হারানোর আতঙ্ক। খ্রিস্টানের গির্জায় আগুন লাগে, হিন্দুর মন্দির ভাঙে, আহমদির উপাসনালয় ঘেরাও হয়, হাজারা শ্রমিককে ধর্মীয় পরিচয় দেখে আলাদা করে হত্যা করা হয়—আর প্রতিটি ঘটনার পর পাকিস্তান রাষ্ট্র নিন্দা জানায়, মামলা নেয়, কখনো ক্ষতিপূরণও দেয়। কিন্তু প্রশ্নটি অন্য জায়গায়: যে রাষ্ট্র একজন নাগরিককে বিপদের পরে সান্ত্বনা দেয়, সে কি বিপদের আগে তাকে রক্ষা করতে পারে না! গত এক দশকের পাকিস্তান সেই প্রশ্নের আশ্বস্ত উত্তর দিতে পারেনি।
ফলে সংখ্যালঘুদের জন্য নাগরিকত্ব সেখানে অনেক সময় কাগজে সমান, জীবনে নয়; সংবিধান অধিকার দেয়, কিন্তু রাস্তায় সেই অধিকারের মূল্য কখনো কখনো দিতে হয় ঘর পুড়িয়ে, রক্ত দিয়ে, কিংবা নিজের দেশেই নীরবে সরে গিয়ে।
৩ জানুয়ারি ২০২১, রোববার। ভোর তখনও পুরোপুরি ফোটেনি। বেলুচিস্তানের মাচ কয়লাখনি এলাকার শ্রমিকদের একটি ঘরে ঘুম ভাঙল অস্ত্রধারীদের উপস্থিতিতে। বাইরে তখন পাহাড়ের শীত। ভেতরে শ্রমিকদের মধ্য থেকে শিয়া হাজারা পরিচয়ের মানুষগুলোকে আলাদা করা হলো। তাঁদের হাত বাঁধা হলো, চোখ ঢেকে নিয়ে যাওয়া হলো কাছের পাহাড়ি এলাকায়। তারপর খুব কাছ থেকে গুলি।
পরের দিন ডন-এর প্রতিবেদনে প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১১ বলা হয়। পরে পত্রিকাটির বিস্তারিত অনুসন্ধানে দশজন হাজারা শ্রমিকের পরিচয় উঠে আসে। তাঁদের একজন সাদিক। পরিবারের কাছ থেকে অনেক দূরে কয়লাখনিতে কাজ করতেন তিনি। এলাকায় মোবাইল যোগাযোগ দুর্বল হওয়ায় বাড়িতে কয়েক দিন কথা না হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। সেদিন হত্যার খবর শোনার পরও ছোট বোন মাসুমা নিজেকে বোঝাচ্ছিলেন—তার ভাই হয়তো নিহতদের মধ্যে নেই। বিকেলের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি খুলতেই তাঁর সেই আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়। মৃত শ্রমিকদের সারির মধ্যে তিনি চিনতে পারেন ভাই সাদিককে।
সাদিকদের কবর দেওয়া হলো সঙ্গে সঙ্গে নয়। কফিন নিয়ে কোয়েটার সড়কে বসে পড়ল হাজারা পরিবারগুলো। শীতের মধ্যে দিনের পর দিন মৃত সন্তান, ভাই ও স্বামীর মরদেহ পাশে রেখে তাঁদের দাবি ছিল—আগে রাষ্ট্র বলুক, জীবিতদের বাঁচাবে কীভাবে।
পাকিস্তানে ধর্মীয় সংখ্যালঘু হওয়ার সংকটের সম্ভবত সবচেয়ে মর্মান্তিক সংজ্ঞা এখানেই। মৃতের জন্য কবর পাওয়ার আগে জীবিতের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইতে হয়।
কিন্তু হাজারা হত্যাকাণ্ড পাকিস্তানের গত দশ বছরের কোনো বিচ্ছিন্ন অন্ধকার নয়। কয়েক বছর পেছনে গেলেই দেখা যায়, সেই অন্ধকার কখনো বোমা হয়ে এসেছে, কখনো জনতা হয়ে, কখনো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ হয়ে।
২৭ মার্চ ২০১৬, ইস্টার সানডের সন্ধ্যা। লাহোরের গুলশান-ই-ইকবাল পার্ক। ছুটির দিনে পার্কজুড়ে শিশু ও পরিবারের ভিড়। একটি আত্মঘাতী বিস্ফোরণ মুহূর্তে সেই পার্ককে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের মতো দৃশ্যে পরিণত করেছিল। ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন; নিহতদের উল্লেখযোগ্য অংশ ছিল শিশু। হামলার দায় নেওয়া জামাতুল আহরার বলেছিল, খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করেই হামলাটি চালানো হয়েছে। যদিও নিহতদের মধ্যে মুসলমানও ছিলেন। হামলাকারীর কাছে ধর্মীয় পরিচয় ছিল লক্ষ্য নির্ধারণের কারণ; বোমার কাছে শেষ পর্যন্ত সবাই শুধু মানুষ।
এর পরের বছর ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭, রোববার, কোয়েটার বেথেল মেমোরিয়াল মেথডিস্ট চার্চে প্রায় ৪০০ মানুষ প্রার্থনায় ছিলেন। দুই হামলাকারী চার্চে প্রবেশের চেষ্টা করে। নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দিলে একজন দরজার কাছেই বিস্ফোরণ ঘটায়। নয়জন নিহত, অর্ধশতাধিক আহত হন। Dawn তখন প্রশ্ন তুলেছিল—নিরাপত্তা-নিয়ন্ত্রিত একটি শহরের কেন্দ্রেও একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যদি প্রার্থনার সময় নিরাপদ না থাকে, তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর অর্থ কোথায়?
তারপর এল ৩০ ডিসেম্বর ২০২০। খাইবার পাখতুনখোয়ার কারাক জেলার তেরি এলাকায় এক হাজারের বেশি মানুষ একটি সমাবেশে জড়ো হয়েছিল। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর জনতার একাংশ এগিয়ে গেল হিন্দু সাধক শ্রী পরমহংস জি মহারাজের শতবর্ষী সমাধির দিকে। প্রথমে দেয়ালে আঘাত, তারপর ভাঙচুর, শেষে আগুন। ডন-এর ছবিতে দেখা যায়, আগুনে জ্বলছে মন্দির; ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে আছে মানুষ। রাষ্ট্র পরে ১০০-র বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বহু পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট মন্দির পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছে।
কিন্তু এই ঘটনাটিও পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ার একটি পরিচিত বৈপরীত্য সামনে আনে—যে রাষ্ট্র পরে মন্দির বানিয়ে দিতে পারে, সে রাষ্ট্র মন্দির ভাঙার মুহূর্তে কেন তাকে রক্ষা করতে পারে না?
এই প্রশ্নটি আরও নির্মম হয়ে ফিরে আসে ১৬ আগস্ট ২০২৩, বুধবার, পাঞ্জাবের জারানওয়ালায়।
দুই খ্রিস্টান ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোরআন অবমাননার অভিযোগ ওঠে। মসজিদের লাউডস্পিকারে ঘোষণা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের নথিতে সকাল ১০টার মধ্যে কয়েক শ মানুষের সংঘবদ্ধ হওয়ার তথ্য আছে। এরপর যা ঘটল, তা কোনো একটি বাড়ির ওপর হামলা ছিল না; একটি সম্প্রদায়ের ওপর সামাজিক আক্রমণ।
মানুষ বাড়ি ছেড়ে পালাল। পেছনে পড়ে রইল বিছানা, কাপড়, রান্নার হাঁড়ি, স্কুলের বই। জনতা গির্জায় ঢুকল, আসবাব বাইরে এনে আগুন দিল; খ্রিস্টানদের বাড়ি লুট ও পুড়িয়ে দেওয়া হলো। এমনকি কবরস্থানও হামলা থেকে রেহাই পায়নি। জেলা প্রশাসনের হিসাবে পরে ৯১টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়; প্রায় দুই ডজন গির্জায় হামলা হয়। অনেক পরিবার সেই রাত ঘরে ফিরতে সাহস পায়নি; খোলা মাঠে রাত কাটিয়েছে।
জারানওয়ালার ঘটনাটির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক সম্ভবত আগুনের সংখ্যা নয়। ভয়াবহতা হলো—একটি অভিযোগ আদালতে প্রমাণ হওয়ার আগেই পুরো একটি পাড়া দোষী হয়ে গেল।
এখানেই পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সংকট আইনের সমস্যা থেকে সমাজের সমস্যায় রূপ নেয়। ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি একজনের বিরুদ্ধে ওঠে, কিন্তু শাস্তি পায় তার পরিবার, প্রতিবেশী, গির্জা, কখনো পুরো সম্প্রদায়। আদালতের বিচার শুরু হওয়ার আগেই রাস্তায় একটি সমান্তরাল আদালত বসে যায়; সেখানে সাক্ষ্য লাগে না, প্রমাণ লাগে না, আপিলের সুযোগও থাকে না।
তার প্রমাণ মিলল আবার ২৫ মে ২০২৪, শনিবার, সারগোধার মুজাহিদ কলোনিতে। পোড়া কোরআনের পৃষ্ঠা পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর খ্রিস্টান নাজির মাসিহর বাড়ির সামনে জনতা জমে যায়। তাঁকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে মারধর করা হয়, তাঁর পরিবারের ছোট জুতার কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করেছিল; কিন্তু মাথায় গুরুতর আঘাত পাওয়া নাজির আর ফিরতে পারেননি। ৩ জুন, নয় দিন পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
এমন সহিংসতায় কখনো ধর্ম একমাত্র কারণ কি না, সেই প্রশ্নও এখন পাকিস্তানের ভেতরেই উঠছে। জমি, দোকান, ব্যবসায়িক বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতাকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ দিয়ে ভয়ংকর শক্তি দেওয়ার বহু অভিযোগ আছে। কারণ পাকিস্তানে এ ধরনের অভিযোগ শুধু মামলা তৈরি করে না; অভিযোগের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চারপাশে তৈরি হতে পারে উত্তেজিত জনতা। ফলে একটি সম্পত্তির বিরোধ কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ধর্ম রক্ষার যুদ্ধে পরিণত হতে পারে।
এ সংকটের আরেকটি মুখ নারী।
পাকিস্তানের সেন্টার ফর সোশ্যাল জাস্টিস (সিএসজে)-এর তথ্য উদ্ধৃত করে ১৮ এপ্রিল ২০২৫ ডন জানায়, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ধর্মান্তর নিয়ে বিতর্কিত ৪২১টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে; এর মধ্যে ২৮২ জন হিন্দু ও ১৩৭ জন খ্রিস্টান মেয়ে বা নারী। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য—ভুক্তভোগীদের ৭১ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। একই প্রতিবেদনে ২০২৪ সালেই ধর্ম অবমাননার ৩৪৪টি নতুন মামলা এবং অভিযোগকে কেন্দ্র করে ১০টি বিচারবহির্ভূত হত্যার তথ্য রয়েছে।
আর ১৮ এপ্রিল ২০২৫, শুক্রবার, করাচির সদর এলাকায় দেখল আরও একটি দৃশ্য। আহমদি সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ের বাইরে কয়েক শ বিক্ষোভকারী। পুলিশ ও রেঞ্জার্সও উপস্থিত। এর মধ্যেই ৪৬ বছরের ব্যবসায়ী লায়েক আহমদ চিমাকে কিছু দূরে ধরে মারধর করা হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি মারা যান। আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ডন জানায়—২০২৩ সালে একই উপাসনালয়ের ওপর হামলার মামলায় চিমা ছিলেন সাক্ষী এবং মৃত্যুর দিন সকালেও আদালতে হাজির হয়েছিলেন।
এর দুদিন পর ২০ এপ্রিল ২০২৫ ডন তাদের সম্পাদকীয়র শিরোনাম দিয়েছিল—“Lesser Citizens”, অর্থাৎ ‘কম মর্যাদার নাগরিক’। পত্রিকাটি প্রশ্ন তুলেছিল, পাকিস্তান কি কখনো সত্যিকার অর্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রাষ্ট্র হতে পারবে?
সম্ভবত এখানেই গত দশ বছরের ঘটনাগুলোর সবচেয়ে গভীর পাঠটি লুকিয়ে আছে।
পাকিস্তানে সংখ্যালঘুদের ওপর প্রতিটি হামলার পর রাষ্ট্র পুরোপুরি নীরব থাকে—এ কথা সত্য নয়। পুলিশ কখনো জীবন বাঁচিয়েছে, সরকার ক্ষতিপূরণ দিয়েছে, আদালত হস্তক্ষেপ করেছে, হামলাকারীদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের নীরবতা সব সময় শব্দের অনুপস্থিতি নয়। নীরবতা কখনো বিচার বিলম্বিত হওয়ার নাম, কখনো ঘৃণাবক্তব্যের সামনে দ্বিধা, কখনো এমন একটি আইনকে সংস্কার করতে ভয় পাওয়া—যে আইনকে কেন্দ্র করে বারবার জনতা আদালতের জায়গা দখল করে নেয়।
রাষ্ট্রের ব্যর্থতাটি তাই শুধু এই নয় যে একটি গির্জা পুড়ল, একটি মন্দির ভাঙল কিংবা একজন আহমদিকে হত্যা করা হলো। আরও বড় ব্যর্থতা হলো—একজন সংখ্যালঘু নাগরিক যদি মনে করতে শুরু করেন, অভিযোগ ওঠার পর তাঁর প্রথম আশ্রয় আদালত নয়, পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা—তখন রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর নাগরিক সম্পর্কটিই ভেঙে পড়ে।
পাকিস্তানের সংবিধান তাঁদের নাগরিক বলে। পতাকা তাঁদেরও। করের টাকায় চলা পুলিশ তাঁদেরও। আদালত তাঁদেরও।
তবু মাচের সেই শীতের ভোর থেকে জারানওয়ালার আগুন, সারগোধার রক্তাক্ত উঠোন থেকে করাচির জনতা—গত দশ বছর একই প্রশ্ন রেখে গেছে:
একজন সংখ্যালঘু নাগরিকের দরজার দিকে যখন উত্তেজিত জনতা হাঁটা শুরু করে, তখন রাষ্ট্র কি তার আগে সেখানে পৌঁছায়—নাকি আবারও পৌঁছায় ছাই ঠান্ডা হওয়ার পরে?
পাকিস্তানের সংখ্যালঘুরা এখনও সম্ভবত সেই উত্তরের অপেক্ষায়।
লেখকঃ সাজ্জাদুল ইসলাম নয়ন