
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত গুম ও হত্যাকাণ্ডসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন তার সাবেক রানার (বডিগার্ড) সেনাসদস্য ইমরুল কায়েস। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনাসহ বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আবেদনও জানান তিনি।
রোববার বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলার পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে ইমরুল কায়েসের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। শুনানির সময় অভিযুক্ত জিয়াউল আহসান আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বর্তমানে ইমরুল কায়েস রংপুর সেনানিবাসে ওয়ারেন্ট অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘২০১২ সালের ১৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টার থেকে মেজর জিয়াউল, মেজর নওশাদ, সাইফসহ মহাখালী ফ্লাইওভারের কাছে যাই। কে বা কাকে গাড়িতে তুলবে তা আমি জানতাম না। তবে গাড়িতে বসে জিয়াউল আহসান বিভিন্ন জায়গায় ফোন করছিলেন- টার্গেট কখন আসবেন। একপর্যায়ে জানা যায় টার্গেট আসবেন না। পরে সেখান থেকে জিয়াউল আহসানকে বাসায় নামিয়ে দেই। পরদিন সকালে আমি ৯ দিনের ছুটিতে বাড়ি যাই। ছুটিতে থাকাকালে ১৮ এপ্রিল বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পারি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে মহাখালী থেকে অপহরণ করা হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এরপর ছুটি শেষে ২৩ এপ্রিল র্যাব হেডকোয়ার্টারের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ে যোগ দেই। যোগদানের পর কর্মস্থলে থমথমে পরিবেশ লক্ষ্য করি। এছাড়া সাধারণত প্রতিদিন সকাল ৯টায় রোল-কল হতো। কিন্তু ১৮ এপ্রিলের পর সকাল ৭টায় হয়েছিল। এভাবে বেশ কয়েকদিন সকালে আসতেন জিয়াউল আহসান।’
সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন জিয়াউল আহসান ফোনে কথা বলার সময় আরেকটি কল আসে। তখন তিনি বলেন, ‘তুই রাখ। তারিক স্যার (সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী) ফোন দিয়েছেন।’
এরপর দীর্ঘ আলাপের এক পর্যায়ে জিয়াউল আহসানকে বলতে শুনেছেন বলে দাবি করেন ইমরুল কায়েস। তার ভাষায়, ‘আপনাদের কথামতো ইলিয়াস আলীকে গলফ (গুম) করলাম। এখন আপনারা এরকম করলে হবে? আমি কমান্ডো মানুষ। তাহলে পোস্টিং দিয়ে জঙ্গলে পাঠিয়ে দেন।’
জবানবন্দিতে আরও অভিযোগ করা হয়, ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর র্যাব সদর দপ্তরের কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ ধ্বংস করা হয়েছিল। একই সঙ্গে ইমরুল কায়েস বলেন, ‘আমি এক বছর তিন-চার মাস জিয়াউল আহসানের বডিগার্ড বা রানার ছিলাম। আমি সে সময় দেখেছি তিনি ওই সময়ে ১৫০/২০০ মানুষকে বিভিন্নভাবে হত্যা করেছেন।’
সাক্ষ্য শেষে নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমি সাক্ষ্য দিয়েছি। এখন আমি নিরাপত্তা চাই।’
যা বললেন চিফ প্রসিকিউটর
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি দাবি করেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে অপহরণের ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের কিলিং নেটওয়ার্ক ভারত-বাংলাদেশজুড়ে ছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে শতাধিক গুম-খুনের ঘটনায় হওয়া মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জিয়াউলের বিরুদ্ধে আজ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দিয়েছেন একজন সেনা কর্মকর্তা। তার জবানবন্দি এখনও চলমান রয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সাক্ষ্যতে তথাকথিত ‘জাফলং অপারেশন’-এর কথাও উঠে এসেছে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, র্যাবের টিএফআই সেল থেকে দুই আসামিকে নিয়ে জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে একটি দল জাফলং যায়। সেখানে ভারত থেকে আসা সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি আরও দুই আসামিকে নিয়ে আসে। পরে তাদের বিনিময় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়।
চিফ প্রসিকিউটরের দাবি, সাক্ষীর বর্ণনা অনুযায়ী ভারত থেকে আনা দুই ব্যক্তিকে জিয়াউল আহসান গুলি করে হত্যা করেন। তিনি বলেন, ‘ভারত থেকে আনা দুজনকে রাস্তায় মাথায় গুলি চালিয়ে হত্যা করেন জিয়াউল আহসান। এভাবেই তিনি হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন।’
এছাড়া বিডিআর সদস্যদের হত্যার অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, সাক্ষী জানিয়েছেন যে কিছু সদস্যকে ইনজেকশন প্রয়োগ করে এবং অন্যদের মাথায় গুলি করে হত্যা করা হতো। পরে মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হতো। এই পদ্ধতিতে প্রায় ১০ থেকে ১২ জন বিডিআর সদস্য নিহত হয়েছেন বলে সাক্ষ্যতে উল্লেখ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গাজীপুরে তিনজনকে হত্যা, বরগুনার পাথরঘাটার চর দুয়ানিতে ৫০ জনকে হত্যার অভিযোগ এবং সুন্দরবনে বনদস্যু দমনের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় একাধিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগসহ তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।