
দেশের প্রান্তিক চাষিদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলে উৎপাদিত ফসলের অপচয় ঠেকাতে এবং মাঠপর্যায়ে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি সুনিশ্চিত করতে এক অভিনব উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। আগামী দুই বছরের মধ্যে সারা দেশে দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত ক্ষুদ্র হিমাগার (কোল্ড স্টোরেজ) নির্মাণের এক মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর বনানীতে কৃষি খাতের ওপর বিশ্বব্যাংকের একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এই যুগান্তকারী তথ্য জানান।
অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী দেশের বিদ্যমান সংরক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে বলেন, জেলা কিংবা উপজেলা পর্যায়ে যেসব বড় বড় হিমাগার রয়েছে, সেগুলো মূলত চাষিদের ফসলি জমি থেকে বেশ দূরে অবস্থিত। এই ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে প্রান্তিক কৃষকেরা বড় কোল্ড স্টোরেজের প্রকৃত সুফল থেকে বঞ্চিত হন। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে এবার সরাসরি কৃষকের ঘরের কাছে কিংবা মাঠের একেবারে কোল্ড স্টোরেজ বা ছোট হিমাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের কারিগরি ও ব্যবস্থাপনা কাঠামো ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, এই হিমাগারগুলো শতভাগ সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে পরিচালিত হবে। এছাড়া প্রতিটি হিমাগার রক্ষণাবেক্ষণ ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে স্থানীয় ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে গঠিত একটি করে বিশেষ কমিটিকে। সরকার ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম বা পাইলটিং সফলতার সাথে সম্পন্ন করেছে। এই পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার চাষি সরাসরি উপকৃত হবেন এবং সেই সাথে ফসলের পরিবহন ব্যয় ও পচনজনিত অপচয় প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে।
একই প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি উদ্বেগজনক তথ্য দিয়ে জানানো হয়, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশে সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনশীলতার প্রবৃদ্ধির গতি অনেকটাই শ্লথ বা ধীর হয়ে পড়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে বিশ্বব্যাংক পরামর্শ দিয়েছে—ঢালাওভাবে রাসায়নিক সারে ভর্তুকি দেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে কৃষি গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তি খাতে বুদ্ধিবৃত্তিক বা ‘স্মার্ট’ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেন, বর্তমানে দেশের মোট কৃষি বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ অর্থই সারের ভর্তুকি দিতে গিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে, যার সিংহভাগ সুবিধা আবার চলে যাচ্ছে তুলনামূলক ধনী ও প্রভাবশালী কৃষকদের পকেটে। এর ফলে আধুনিক সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও উচ্চতর গবেষণার মতো জরুরি অবকাঠামোগত খাতগুলো প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ আরও জানান, সরকার পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশকে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি সেচকাজে ব্যবহৃত গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে, যা চাষের মৌসুম শেষে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবে। এছাড়া মাটির অম্লতা বা পিএইচ (pH) ভারসাম্য ঠিক করার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ক্ষতিকর ব্যবহার ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়।
সানেম ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের মানুষের খাদ্যতালিকায় এখন প্রথাগত চালের ওপর নির্ভরতা কমছে; বিপরীতে ফলমূল, শাকসবজি এবং আমিষ বা প্রোটিনজাতীয় খাবারের চাহিদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্যানেল আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান কৃষি ভর্তুকি নীতি ফসলের বহুমুখীকরণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে খুব একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করছে না। তাই তারা স্বল্পমেয়াদে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সঠিক মূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় কৃষিকে সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নির্ভর ও বহুমুখী করার ওপর বিশেষ জোর দেন।