
গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের (ডিআরসি) পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ গতিতে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারি ইতিহাসের অন্যতম মারাত্মক সংকটে রূপ নিতে পারে বলে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পূর্ববর্তী ঘটনাগুলোর তুলনায় এবারের পরিস্থিতি সার্বিকভাবে অনেক বেশি আশঙ্কাজনক ও জটিল হয়ে উঠছে।
স্মরণকালের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক ইবোলা প্রাদুর্ভাবের সাক্ষী হয়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের পশ্চিম আফ্রিকা, যেখানে মারা যান ১১ হাজারের বেশি মানুষ। পরবর্তীতে ২০১৮ থেকে ২০২০ মেয়াদে ডিআরসির পূর্বাঞ্চলেই ইবোলার ছোবলে ২ হাজার ২৮৭ জনের প্রাণহানি ঘটে।
তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্যমতে, চলতি বছরের ২১ জুলাই পর্যন্ত ডিআরসিতে ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা ২ হাজার ৫০০ জন ছাড়িয়েছে এবং প্রাণহানি ঘটেছে প্রায় ১ হাজার মানুষের। সীমান্তঘেঁষা দেশ উগান্ডাতেও ২০ জনের দেহে এ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয় এবং মারা যান ২ জন। যদিও উগান্ডা সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে, ১৬ জুলাইয়ের মধ্যেই সেখানে শেষ আক্রান্ত রোগীটি রোগমুক্ত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমান প্রাদুর্ভাবটি অতিমাত্রায় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠার পেছনে প্রধান দুটি কারণ বিদ্যমান। প্রথমত, অঞ্চলটিতে ছড়িয়ে পড়া ধরনটি হলো 'বান্ডিবুগিও' প্রজাতির ইবোলা ভাইরাস, যার কোনো অনুমোদিত প্রতিষেধক বা নির্দিষ্ট কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি এখন পর্যন্ত আবিষ্কার হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বেশ কিছুদিন শনাক্তের বাইরে থেকে নীরবে ছড়িয়ে পড়ার পর গত ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মহামারির ঘোষণা আসে। তার ওপর বিগত এক বছরে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহায়তার আর্থিক প্রবাহ কমে আসায় রোগ নির্ণয় ও নজরদারি ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সংক্রমণের মূল কেন্দ্রস্থল হয়ে উঠেছে উগান্ডা সীমান্ত সংলগ্ন 'ইতুরি' প্রদেশ। অঞ্চলটিতে দীর্ঘদিনের সংঘাতময় পরিবেশ, চরম নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর স্থানীয় অধিবাসীদের বিশ্বাসের অভাবে রোগী খুঁজে বের করা ও তাদের চিকিৎসা প্রদান করা দুরূহ হয়ে উঠেছে।
এদিকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বহুবিধ প্রতিকূলতার মুখোমুখি হচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা। প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর (পিপিই) অভাব, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আতঙ্ক, মাসের পর মাস বেতন বকেয়া থাকা এবং অসন্তুষ্ট জনরোষের মুখোমুখি হয়েও তারা সেবাদান অব্যাহত রেখেছেন।
অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের মনে ইবোলার অস্তিত্ব নিয়ে তীব্র সংশয় থাকায় তারা চিকিৎসা কেন্দ্রে আসতে অনীহা দেখাচ্ছেন, যার ফলে রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইতুরির বুনিয়া শহরের কাছে অবস্থিত রুয়ামপারা জেনারেল হাসপাতালে সম্প্রতি কয়েক ডজন স্বাস্থ্যকর্মী তাদের বকেয়া পাওনার দাবিতে কাজ বন্ধ করে দেন, যেখানে একটি বৃহৎ ইবোলা চিকিৎসা কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। এর আগে মে মাসে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা ওই সেন্টারের একটি অংশে অগ্নেয়সংযোগ করে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর চড়াও হওয়ার চেষ্টা চালায়।
ডব্লিউএইচও-এর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, সেবা দিতে গিয়ে এ পর্যন্ত ১০০ জনেরও বেশি স্বাস্থ্যকর্মী ইবোলায় সংক্রামিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫ জন। এমন জীবনঘাতী পরিস্থিতির মাঝেই চরম ঝুঁকি কাঁধে নিয়ে সংক্রমণ রুখতে লড়াই করে যাচ্ছেন নিয়োজিত কর্মীরা।