
আফগানিস্তান যুদ্ধে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সেনারা সম্মুখসমরে সক্রিয় ছিল না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন বক্তব্যকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তিনি মন্তব্যটিকে ‘অপমানজনক ও ভয়ানক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি নিহত সেনাদের পরিবারগুলোর জন্য গভীর কষ্টের। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) এক ভিডিও বার্তায় তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান।
এর আগে বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স নিউজে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, আফগানিস্তানে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো সেনা পাঠালেও তারা সম্মুখসমরে সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। তাঁর ভাষায়, ‘তারা বলবে যে তারা আফগানিস্তানে সেনা পাঠিয়েছিল। পাঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তারা সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে নিরাপদ অবস্থানে থাকত।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র সংকটে পড়লে ন্যাটোর মিত্ররা হয়তো পাশে দাঁড়াবে না।
এই বক্তব্য যুক্তরাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেন, আফগানিস্তানে দায়িত্ব পালনকালে যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনীর ৪৫৭ জন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু সেনা স্থায়ীভাবে আহত হয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই মন্তব্য শুধু অপমানজনক নয়, এটি ভয়ানকও। যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাঁদের জন্য এটি গভীর কষ্টের। আমি যদি এমন ভুল তথ্য দিতাম, অবশ্যই ক্ষমা চাইতাম।’
তবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর এই সমালোচনার সঙ্গে একমত নয় হোয়াইট হাউস। ট্রাম্পের অবস্থানের পক্ষে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স এএফপিকে বলেন, ন্যাটোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র অন্য সব দেশের সম্মিলিত অবদানের চেয়েও বেশি করেছে। তাঁর ভাষায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একদম সঠিক কথা বলেছেন’।
যুক্তরাজ্যের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগানিস্তানে এক লাখ ৫০ হাজারের বেশি ব্রিটিশ সেনাসদস্য দায়িত্ব পালন করেন। নিহত ৪৫৭ জনের মধ্যে ৪০৫ জন সরাসরি শত্রুপক্ষের হামলায় প্রাণ হারান। একই সময়ে দীর্ঘ এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দুই হাজার ৪০০ জনের বেশি সেনা নিহত হন।
ট্রাম্পের মন্তব্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বর্তমান ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তারাও। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, তাঁরা ছিলেন বীর এবং জাতির সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। যুক্তরাজ্যের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী আল কার্নস—যিনি আফগানিস্তানে পাঁচটি মিশনে অংশ নিয়েছিলেন—ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘সম্পূর্ণ হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দেন।
বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেইডনকও মন্তব্যটিকে ভিত্তিহীন বলে আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেন যে, এ ধরনের বক্তব্য ন্যাটো জোটকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নেন যুক্তরাজ্যের রিফর্ম ইউকে দলের নেতা ও ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের মিত্র নাইজেল ফারাজ। তিনি বলেন, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প ভুল বলছেন। ২০ বছর ধরে ব্রিটিশ সেনারা মার্কিন সেনাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে।’
আফগান যুদ্ধে সরাসরি সম্মুখসমরে অংশ নেওয়া ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স হ্যারি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আমি সেখানে দায়িত্ব পালন করেছি। বন্ধু বানিয়েছি, আবার অনেক বন্ধুকে হারিয়েছি। হাজার হাজার মানুষের জীবন চিরতরে বদলে গেছে। মা–বাবারা তাঁদের সন্তানদের দাফন করেছেন, অসংখ্য শিশু এতিম হয়েছে। সেই আত্মত্যাগ নিয়ে সত্য ও সম্মানের সঙ্গে কথা বলা উচিত।’
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য কেবল যুক্তরাষ্ট্র–যুক্তরাজ্য সম্পর্কেই নয়, বরং পুরো ন্যাটো জোট এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ওপরও নতুন করে চাপ সৃষ্টি করেছে।