
দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে নতুন করে সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হচ্ছেন হাজারো শ্রমিক। খাত-সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী মাসগুলোতে আরও অনেক কারখানা বন্ধ হতে পারে, যা কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
শুক্রবার (২৬ জুন) প্রকাশিত ডব্লিউডব্লিউডি-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ঈদের পর গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় অবস্থিত ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এতে প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক একসঙ্গে চাকরি হারিয়েছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ, পূর্বঘোষণা ছাড়াই তাদের ছাঁটাই করা হয়েছে। দীর্ঘদিন কাজ করার পরও হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন তারা।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, গ্যাস-বিদ্যুতের উচ্চমূল্য, ডলার সংকট, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ এবং চলতি মূলধনের ঘাটতির কারণে অনেক কারখানা টিকে থাকতে পারছে না। পাশাপাশি ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের ফলে ব্যয় আরও বেড়েছে।
বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে প্রায় ৪০০ পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের সাতটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৪৫৭টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে ২০৫টি পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ না থাকায়, ১৯০টি আর্থিক সংকটে এবং বাকি কারখানাগুলো শ্রমিক অসন্তোষ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যাংকিং জটিলতা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট ও কাঁচামালের অভাবসহ বিভিন্ন কারণে বন্ধ হয়েছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, শুরুতে অর্ডারের ঘাটতি থাকলেও পরে তা চলতি মূলধনের সংকটে রূপ নেয়। অনেক কারখানা ঋণপত্র (এলসি) খুলতে না পারায় কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হয়েছে। এছাড়া কোভিড-১৯ পরবর্তী পরিস্থিতি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি এবং সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকটও পোশাক শিল্পের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
এদিকে শ্রমিক নেতারা অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ব্যবসায়িক মন্দার অজুহাতে অভিজ্ঞ শ্রমিকদের ছাঁটাই করে ব্যয় কমানোর প্রবণতাও বেড়েছে বলে তাদের দাবি।
সংকট মোকাবিলায় সরকার, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিউএফটির যৌথ উদ্যোগে আগামী তিন বছরে ২২ হাজার ৮১৫ জন পোশাক শ্রমিক ও মধ্যম সারির কর্মকর্তাকে আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। তাই এই খাতের সংকট দীর্ঘায়িত হলে শুধু শ্রমিক নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপে পড়বে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণের ওপর জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।