
কখনো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব, কখনো গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঝানু প্রকৌশলী, আবার কখনো খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পার্সোনাল অফিসার! এমন সব চোখকপালে ওঠা ভুয়া পরিচয় ভাঙিয়ে এবং ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর জাল পেতেছেন খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) চাকরিচ্যুত চেইনম্যান মুজিবুর রহমান। অভিনব এই জালিয়াতির ঘটনায় দেশের বিভিন্ন আদালতে তার বিরুদ্ধে ১১টি মামলার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি থাকলেও রহস্যজনক কারণে ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন এই প্রতারক। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ করে তিনি রাজধানীর বুকেই বহাল তবিয়তে তার নতুন নতুন প্রতারণার জাল বিস্তার করে চলেছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানেও মুজিবুরের এই আকাশচুম্বী অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার সত্যতা মিলেছে। শুধু ভুয়া পদবিই নয়, নিজের প্রভাব জাহির করতে তিনি দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তোলা ছবি ব্যবহার করেও সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানী ঢাকার রাজউক পূর্বাচল প্রকল্পে প্লট পাইয়ে দেওয়ার নাম করে মোস্তাফিজুর রহমান নামক এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন মুজিবুর। পরবর্তীতে জমি রেজিস্ট্রি না করে উল্টো ওই ব্যবসায়ীর সই ও স্ট্যাম্প জাল করে তার বিরুদ্ধে ৬ কোটি টাকার একটি ‘মিথ্যা’ মামলা ঠুকে দেন তিনি। তবে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) দীর্ঘ তদন্ত শেষে মুজিবুরের করা মামলাটি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে প্রমাণ করে। এরপর তিনি একই ব্যবসায়ীর নামে আরও একটি সাজানো মামলা করলেও সেটিও ভুয়া প্রমাণিত হয়।
প্রতারণার শিকার ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান তার অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেন, "পূর্বাচলে একটি প্লটের জন্য ৩ কোটি ৭ লাখ টাকা দিয়ে জমি রেজিস্ট্রি না হওয়ায় এবং বারবার সময় নেওয়ায় তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় সাধারণ ডায়ারি (জিডি ) করেছেন তিনি।"
তদন্ত সংশ্লিষ্ট পিবিআইয়ের এক কর্মকর্তা মুজিবুরের প্রতারণার গভীরতা উল্লেখ করে বলেন, "মুজিবুর একজন অনেক বড় মাপের প্রতারক। তদন্তে প্রমাণ হয়েছে মুজিবুর যেসব তথ্য দিয়ে মামলা করেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সে অনেক মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা প্রতারণার মাধ্যমে হাতিয়ে নেয় বলেও তদন্তে প্রমাণ হয়েছে।"
ওই পুলিশ কর্মকর্তা আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়ে জানান, "মজিবুর শুধু সাধারণ মানুষের সঙ্গেই প্রতারণা করেননি, তিনি পুলিশের অনেক সদস্যের সঙ্গেও প্রতারণা করেছেন। এমনকি পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরে তিনি ‘মিথ্যা তথ্য’ দিয়ে অভিযোগ সেলে অভিযোগ জমা দেন। ঐ অভিযোগ তদন্ত করে মিথ্যা প্রমাণ পায় পুলিশ। এই অভিযোগে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও জামিনে বের হয়ে আবারও প্রতারণা শুরু করেন।"
মুজিবুরের প্রতারণার হাত থেকে রেহাই পাননি সমাজের কোনো স্তরের মানুষই। তার পাতা ফাঁদে পা দিয়ে একজন কলেজ শিক্ষক এখন সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন। অন্যদিকে এক প্রবীণ নাগরিকের ব্যবসার ৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আরেকটি ঘটনার তদন্ত করছে পিবিআই।
ফিরে দেখা যাক তার অপরাধের শুরুটা কোথায়। ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর ঘুষ, দুর্নীতি ও নানাবিধ গুরুতর অনিয়মের দায়ে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে চেইনম্যানের পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় মুজিবুর রহমানকে। চাকরি হারানোর পর থেকেই তিনি নানামুখী ছদ্মবেশ ধারণ করে প্রতারণাকেই মূল পেশা হিসেবে বেছে নেন। রাজউকের প্লট দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করার পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের ভুয়া ব্যাংক চেক দিয়েও প্রতারণা করেন, যা পরবর্তীতে ব্যাংকে ডিজঅনার বা প্রত্যাখ্যাত হয়।
নিজে আলিশান ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ির মালিক হলেও সব অভিযোগ অবলীলায় অস্বীকার করে মুজিবুর রহমান বলেন, "ফ্ল্যাট ও গাড়ি থাকার বিষয় আমি স্বীকার করছি। তবে এসব তো ব্যাংক লোনে কেনা হয়েছে। আর প্রতারণার অভিযোগ পুলিশ তদন্ত করছে। এখন পর্যন্ত পুলিশ আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রতারণার প্রমাণ পায়নি।"
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের রঙ বদলাতেও পটু এই প্রতারক। পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, মুজিবুরের রাজনৈতিক কোনো আদর্শ নেই। পূর্বে নিজেকে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক সদস্য দাবি করে ফায়দা লুটলেও, রাজনৈতিক পালাবদলের পর এখন তিনি নিজেকে বিএনপির লোক বলে প্রচার চালাচ্ছেন।
তার প্রতারণার শিকার হয়ে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিটিভির সাবেক পরিচালক শেখ আব্দুল সালেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "প্রতারক মুজিবুর বহু সহজ সরল মানুষকে তার প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন। তার বিরুদ্ধে আদালতের এতগুলো ওয়েরেন্ট থাকার পরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয় না। এত কিছুর পরও নতুন করে তার প্রতারণার বিভিন্ন কাহিনি আমরা জানতে পেরেছি।"
প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে একজন চিহ্নিত অপরাধীর এমন অবাধ বিচরণ ও কোটি কোটি টাকার জালিয়াতির ঘটনা এখন খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদিচ্ছা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।