
মুমূর্ষু রোগীদের জীবন বাঁচানোর জন্য কেনা প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা মূল্যের একটি আধুনিক লাইফ সাপোর্ট (আইসিইউ) অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহার করে আসন্ন গণভোটের প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে নাটোর জেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। নাটোর পৌরসভার মালিকানাধীন এই অ্যাম্বুলেন্সকে প্রচারণার কাজে ব্যবহার করায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে পৌরসভা চত্বরসংলগ্ন সড়কে দেখা যায়, অ্যাম্বুলেন্সটির গায়ে হ্যাঁ-না ভোটসংক্রান্ত স্টিকার লাগানো এবং ছাদে সাউন্ড সিস্টেম বসানো হয়েছে। এরপর এটি কানাইখালি পুরাতন বাসস্ট্যান্ডসহ শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরে গণভোটের প্রচারণা চালায়।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের শুরুর দিকে ভারত সরকার নাটোর পৌরসভা, নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতাল এবং সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে একটি করে মোট তিনটি অত্যাধুনিক আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্স উপহার দেয়। ওই বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি নাটোর পৌরসভা প্রাঙ্গণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার সঞ্জীব কুমার ভাটি নাটোর পৌর মেয়রের হাতে অ্যাম্বুলেন্সের চাবি তুলে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে দক্ষ জনবল না থাকা এবং অতিরিক্ত ভাড়ার অজুহাতে এই অ্যাম্বুলেন্সটি সাধারণ মানুষের জরুরি প্রয়োজনে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়নি। শুরুতে এটি নিয়ে পৌরবাসীর মধ্যে ব্যাপক আশাবাদ তৈরি হলেও বাস্তবে খুব কম মানুষই এর সেবা পেয়েছেন। পৌর কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ছিল, বিশেষায়িত এই অ্যাম্বুলেন্স পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ টেকনিশিয়ান ও জনবল নেই এবং সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সের তুলনায় এর ভাড়াও বেশি নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিন ধরে গ্যারেজেই পড়ে থেকে মূল্যবান এই যানটি অব্যবহৃত অবস্থায় ছিল।
এমন পরিস্থিতিতে জনসেবায় ব্যবহারের পরিবর্তে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সকে গণভোটের প্রচারণায় কাজে লাগানোয় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
কানাইখালি এলাকার বাসিন্দা শামসুল আলম বলেন, “অ্যাম্বুলেন্সটি ছিল মানবতার সেবার জন্য, ভোটের প্রচারণার জন্য না। এটি জনস্বার্থের পরিপন্থি কাজ।”
মাদ্রাসামোড়ের বাসিন্দা আব্দুল বাতেন বলেন, “অ্যাম্বুলেন্স মানেই জীবন বাঁচানোর বাহন। জনবল নিয়োগ দিয়ে এটি মানুষের সেবায় ব্যবহার করা যেত। এটা যদি ভোটের কাজে ব্যবহার হয়, তাহলে অসুস্থ মানুষ যাবে কোথায়?”
বড়গাছা এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, “পৌরসভার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে এ ধরনের বিতর্কিত কাজ হতে পারে তা ভাবা যায় না। কারা এটি করে গণভোটের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যুকে খেলা করার চেষ্টা করতেছে তার খুঁজে বের করার দরকার।”
এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মানবাধিকার কর্মী বুলবুল আহমেদ বলেন, “গণভোটের প্রচারণা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরে গিয়ে এখন অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এতে প্রচারণার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। যারা এসব প্রতিষ্ঠান ও প্রচারণা সংশ্লিষ্ট তাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”
নাটোর পৌরসভার পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহমান জানান, সকালে পৌরসভায় এসে তিনি অ্যাম্বুলেন্সে হ্যাঁ-না ভোটের স্টিকার লাগানো দেখতে পান। তবে অ্যাম্বুলেন্সটি হঠাৎ করে প্রচারণার বাহনে রূপান্তরের বিষয়ে আগে থেকে পৌর কর্তৃপক্ষকে কিছু জানানো হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে নাটোর পৌরসভার পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক এস.এইচ.এম. মাগ্ফুরুল হাসান আব্বাসী বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। কথা বলে জানাতে পারব।”