
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নবগঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিন পার হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের স্থবিরতা এখনও কাটেনি। ঢাকা ও নয়াদিল্লির সম্পর্ক আগের অবস্থানেই রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে ভারতের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ‘দ্য হিন্দু’।
মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করেছে, নয়াদিল্লির আচরণে এই মুহূর্তে ঢাকা মোটেও সন্তুষ্ট নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের ওপর ভারতের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ও বিধিনিষেধ এখনও বহাল থাকাই এর মূল কারণ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ভারত দুই দফায় তাঁর শরণাপন্ন হয়েছিল। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক জানাতে ঢাকায় আসেন এবং তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি ঢাকা সফর করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র হস্তান্তর করেন। এছাড়া গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নেন ভারতের লোকসভার স্পিকার ওম বিরলা।
একটি সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে ‘দ্য হিন্দু’ জানিয়েছে, ভারতের এই কূটনৈতিক সৌজন্যতাকে বিএনপির কাছে পর্যাপ্ত মনে হয়নি। দলের একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করে, নতুন সরকারের প্রতি সদিচ্ছার প্রকাশ হিসেবে মোদি সরকারের উচিত ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধ দ্রুত তুলে নেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে:
বাংলাদেশি পণ্যের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালু করা।
ব্যবসা ও চিকিৎসাসহ সব ধরনের ভিসা পূর্ণমাত্রায় চালু করা।
ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর থাকা কড়াকড়ি প্রত্যাহার।
কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে এমন কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না দেখায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক পুনর্গঠনে বিশেষ আগ্রহী হচ্ছেন না।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএনপির সিনিয়র নেতারা জনমনে এমন বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে—সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। অথচ এর আগের অন্তর্বর্তী সরকার হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে ছিল। বিএনপির এমন ইতিবাচক মনোভাবের বিপরীতেও ভারত কোনো অনুকূল সাড়া দেয়নি।
এর উদাহরণ হিসেবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে বিজেপি সরকার গঠনের পর রাজনৈতিকভাবে 'অবৈধ অভিবাসী' শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার এবং কথিত বাংলাদেশিদের পুশব্যাক করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশি কূটনীতিকদের মতে, ঢাকা এই মুহূর্তে 'অবৈধ অভিবাসী' বিতর্কের চেয়ে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়ন এবং ভিসা সমস্যা সমাধানের দিকেই বেশি নজর দিতে আগ্রহী।
সম্পর্কের গভীরতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে বৈঠক করতে দিল্লি সফরে যান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। তবে দ্য হিন্দুর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ওই সময়েও ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারণায় বাংলাদেশ নিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং ভারতে অবস্থানরত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক মন্তব্য প্রচার অব্যাহত ছিল।
ঢাকায় কর্মরত বাংলাদেশের একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক দ্য হিন্দুকে জানিয়েছেন, রাজ্য নির্বাচনের উসকানিমূলক বক্তব্য ভারতের মূল পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলবে না বলে দিল্লি থেকে ঢাকাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। তবে ভারত সেই কথা রাখেনি। কথিত অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে ভারতের এই বর্তমান আচরণকে বাংলাদেশ 'বিশ্বাসঘাতকতা' হিসেবে দেখছে বলে মন্তব্য করেন ওই কূটনীতিক।
ভারতের কাছ থেকে আশানুরূপ ও প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন ভারতের বদলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অগ্রাধিকার হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে ‘দ্য হিন্দু’র প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।