
বাংলাদেশ ও তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে আঙ্কারা যে তিনটি নতুন কাঠামোর ঘোষণা দিয়েছে, তা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন ধাপে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঢাকা সফর শেষে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এসব উদ্যোগ তুলে ধরেন, যেখানে প্রতিরক্ষা ও রাজনৈতিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সফরের অংশ হিসেবে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান-এর সঙ্গে বৈঠক করেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠক শেষে দুই দেশ সম্পর্ককে আরও কাঠামোবদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনটি নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দেয়।
এর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের অংশগ্রহণে বার্ষিক ‘২+২ বৈঠক’, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিদ্যমান বৈঠককে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে উন্নীত করা এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামো চালু হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক শুধু বাণিজ্য বা উন্নয়ন সহযোগিতার সীমা ছাড়িয়ে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার পর্যায়ে প্রবেশ করছে। বিশ্বের বড় শক্তিগুলো সাধারণত যেসব দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক গড়ে তোলে, সেখানেই ‘২+২ বৈঠক’ চালু থাকে।
তুরস্ক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, নেদারল্যান্ডস ও ভারতের সঙ্গে নিয়মিত এই কাঠামোর অধীনে বৈঠক করে থাকে। এবার সেই তালিকায় বাংলাদেশ যুক্ত হওয়াকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকায় অবস্থানকালে হাকান ফিদান বলেন, দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারত্বকে আরও গভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে উন্নীত করার কাজ চলমান রয়েছে। তিনি প্রতিরক্ষা শিল্প, বাণিজ্য ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন।
তুরস্কের ‘এশিয়া এনিউ’ নীতির আওতায় এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্য রয়েছে। ২০১৯ সালে ঘোষিত এই নীতির মাধ্যমে আঙ্কারা মূলত এশিয়াকে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে সম্পর্ক বিস্তারের কৌশল নিয়েছে।
এই নীতির অন্যতম অগ্রাধিকার বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি। বাংলাদেশ-তুরস্ক দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১৩০ কোটি ডলার থেকে ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশকে এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় অংশীদার নয়, বরং কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছে তুরস্ক। বিশেষ করে প্রতিরক্ষা, অবকাঠামো, লজিস্টিকস, সবুজ জ্বালানি, প্রযুক্তি ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীদের একই কাঠামোর আওতায় আনা দুই দেশের সম্পর্ককে বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতার বাইরে ভূরাজনৈতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
ঢাকা সফর শেষে কূটনৈতিক পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, এই তিনটি নতুন কাঠামো দুই দেশের সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিতে স্থাপন করবে, যা রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব থেকে সম্পর্ককে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখবে।
সব মিলিয়ে, তুরস্কের এই উদ্যোগকে বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।