
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব, অর্থনীতি, কৃষি ও সংস্কৃতির মূল চালিকাশক্তি নদীকে সুরক্ষার বার্তা নিয়ে আজ শনিবার (২৩ মে) সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে জাতীয় নদী দিবস। বিপন্ন নদ-নদীর পুনরুদ্ধার এবং জনজীবনে এর অপরিসীম গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও দেশব্যাপী বর্ণাঢ্য ও সচেতনতামূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।
এ বছর দিবসটির মূল সুর নির্ধারণ করা হয়েছে—‘নদী বাঁচলে দেশ বাঁচবে, নদী রক্ষায় সবাই এগিয়ে আসুন।’
জাতীয় নদী দিবসকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে দেশের প্রত্যন্ত জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সেমিনার, উন্মুক্ত আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা, নদী পরিচ্ছন্নতা অভিযান, গাছ লাগানো এবং সচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। পরিবেশবাদী বিভিন্ন নেটওয়ার্ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো নদী সুরক্ষায় সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে এসব কর্মসূচির সূচনা করেছে।
দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে আজ শনিবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করেছে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বুনিয়াদ গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। দেশের কৃষি খাতের সেচ, অভ্যন্তরীণ নৌযোগাযোগ, দেশীয় মৎস্যসম্পদ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার মূলত নদীনির্ভর। অতীতে নদীপথই ছিল যাতায়াতের প্রধানতম মাধ্যম, যা এখনও দেশের বহু অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে টিকে রয়েছে।
তবে আশঙ্কার কথা হলো, লাগামহীন নদী দখল, বর্জ্য ও পলিথিন দূষণ, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং শিল্পবর্জ্যের অবাধ মিশ্রণে দেশের অধিকাংশ নদী এখন অস্তিত্বের চরম সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ঢাকার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর ভয়াবহ দূষণ দীর্ঘকাল ধরে পরিবেশবিদদের ভাবিয়ে তুলছে। এর বাইরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য ছোট-বড় নদী নাব্যতা হারিয়ে মরণদশায় উপনীত হয়েছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, নদী স্রেফ একটি জলধারা নয়, এটি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা। নদী টিকে থাকলে সচল থাকবে দেশের কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক পরিবেশ। পক্ষান্তরে, নদী যদি মরে যায় তবে জলবদ্ধতা, ভয়াবহ বন্যা, খরা এবং পরিবেশ দূষণের মতো দুর্যোগের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবকে আরও ত্বরান্বিত করবে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে নদী রক্ষায় বেশ কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে নদীর সীমানা খুঁটি নির্ধারণ, উচ্ছেদ অভিযান, নাব্যতার সংকট কাটাতে ড্রেজিং বা নদী খনন এবং দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত নজরদারি অন্যতম। নদী কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা এই লক্ষ্য অর্জনে মাঠে কাজ করছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, নদী সুরক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা ও জবাবদিহিতামূলক তদারকি।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) পরিসংখ্যান বলছে, ভৌগোলিক কারণে দেশে শত শত নদ-নদী জালের মতো ছড়িয়ে থাকলেও এর একটি বড় অংশই আজ মৃতপ্রায়। এই সংকট থেকে উত্তরণে সমন্বিত ও টেকসই উদ্যোগের বিকল্প নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
একই সাথে গবেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নদীর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পরিবেশ ও নদী সংরক্ষণ বিষয়ক পাঠ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রম আরও জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি।
নদী মূলত বাংলাদেশের ভৌগোলিক মানচিত্রেরই শুধু অংশ নয়, এটি এ দেশের প্রাণস্পন্দন। নদীকে সচল ও দূষণমুক্ত রাখা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনমান সুরক্ষিত থাকবে। তাই এই জাতীয় নদী দিবসে নদী সুরক্ষার দৃঢ় শপথই হতে পারে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ বিনির্মাণের মূল ভিত্তি।