
দেশের চলমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় এবং নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি আদায়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই থেকে এপ্রিল) লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঋণের প্রাপ্তি ও প্রতিশ্রুতি—উভয় ক্ষেত্রেই এক বড় স্থবিরতা দৃশ্যমান হয়েছে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, একদিকে যখন বিদেশি সহায়তার পাইপলাইন সংকুচিত হচ্ছে, ঠিক তখনই আগের নেওয়া ঋণের আসল ও সুদের কিস্তি পরিশোধের চাপ বেড়েই চলেছে।
আজ রোববার (২৪ মে) সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) পক্ষ থেকে হালনাগাদ করা সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির এই উদ্বেগজনক চিত্রটি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
ইআরডির প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়ের সামগ্রিক লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৭.৮৬৮ বিলিয়ন ডলার। তবে অর্থবছরের ১০ মাস পার হয়ে গেলেও লক্ষ্যমাত্রার মাত্র অর্ধেকের সামান্য বেশি পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও দেশের কাছ থেকে অর্থ ছাড় হয়েছে মাত্র ৪.২৩৬ বিলিয়ন ডলার, যা মোট বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫৩.৮৪ শতাংশ।
গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, এবার অর্থছাড়ের পরিমাণ প্রায় ১৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কারণ, গত অর্থবছরের এই প্রথম ১০ মাসে উন্নয়ন সহযোগীরা সব মিলিয়ে ৫.১২৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থ ছাড় করেছিল।
ঋণ প্রাপ্তি কমার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রকল্পের জন্য নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার গতিও বেশ ধীর। চলতি অর্থবছরে দাতা দেশ ও সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ৬.৭১৫ বিলিয়ন ডলারের নতুন বৈদেশিক ঋণের প্রতিশ্রুতি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সরকার। কিন্তু এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে সেই প্রতিশ্রুতির ঝোড়ো গতি থমকে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.৮০৭ বিলিয়ন ডলারে, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৪১.৮৪ শতাংশ।
স্মর্তব্য যে, গত অর্থবছরের একই সময়ে ৪.২৫৯ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পেরেছিল বাংলাদেশ। সেই হিসাবে গত বছরের একই মেয়াদের তুলনায় এবার প্রতিশ্রুতি কমেছে ৩৪ শতাংশ।
ভূ-অর্থনৈতিক এই সংকটের মাঝে বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড়ের গ্রাফ নিচের দিকে নামলেও, ঋণের বিপরীতে কিস্তি পরিশোধের ব্যয়ের গ্রাফ ঠিকই ঊর্ধ্বমুখী। ইআরডির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের ঋণের কিস্তি বাবদ মোট ৩.৫০৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ। তবে চলতি অর্থবছরের একই ১০ মাসে সেই ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮০২ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, গত বছরের তুলনায় এবার দেশের জাতীয় কোষাগার থেকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ ৮.৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করছে।